আফ্রিকায় ইউরোপীয় শক্তিবর্গের আগমনের কারণ।

 প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ের বিশ্ব ইতিহাসে সাম্রাজ্যবাদ ও উপনিবেশবাদ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। শিল্পবিপ্লবের পর ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্র অর্থনৈতিক শক্তি ও সামরিক ক্ষমতায় দ্রুত অগ্রসর হয়। ফলে তারা নিজেদের শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, অতিরিক্ত পুঁজি বিনিয়োগ এবং রাজনৈতিক-সামরিক প্রভাব বিস্তারের জন্য এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনে প্রতিযোগিতায় নামে। আফ্রিকা এই প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্রে পরিণত হয়।
উনিশ শতকের প্রথমার্ধে আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে ইউরোপীয়দের বাণিজ্যিক ও ধর্মীয় কার্যক্রম থাকলেও ১৮৭০-এর দশকের পর আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ অঞ্চল দখলের প্রতিযোগিতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ১৮৮৪–৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনের পর আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতা আরও সংগঠিত রূপ নেয়। কয়েক দশকের মধ্যে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালিসহ ইউরোপীয় শক্তিগুলো আফ্রিকার বিশাল অংশ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এই ঘটনাকে ইতিহাসে “Scramble for Africa” বা আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতা বলা হয়।
আফ্রিকায় ইউরোপীয় আগমনের পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করেনি। অর্থনৈতিক স্বার্থ, শিল্পবিপ্লব, জাতীয়তাবাদ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ধর্মপ্রচার, ভৌগোলিক অনুসন্ধান, কৌশলগত স্বার্থ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি—সবকিছু মিলেই এই উপনিবেশবাদী বিস্তারকে ত্বরান্বিত করে।


আফ্রিকায় ইউরোপীয় শক্তিবর্গের আগমনের কারণ

আফ্রিকায় ইউরোপীয় শক্তিবর্গের আগমনের কারণ

ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন কারণে সারা পৃথিবীতে উপনিবেশ স্থাপন করেছে। তাদের আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপনের পেছনেও নানাবিধ কারণ ও প্রেক্ষাপট বিদ্যমান ছিল। নিম্নে ইউরোপীয় কারণসমূহ ব্যাখ্যা করা হলো : 

১. ইউরোপীয় ভ্রমণকারী ও অভিযাত্রীদের ভূমিকা

আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ অঞ্চল সম্পর্কে ইউরোপীয়দের জ্ঞান দীর্ঘদিন সীমিত ছিল। উনিশ শতকে বিভিন্ন ইউরোপীয় অভিযাত্রী আফ্রিকার নদী, ভূপ্রকৃতি, জনপদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে শুরু করেন। ডেভিড লিভিংস্টোন, হেনরি মর্টন স্ট্যানলি, পিয়েরে সাভর্গনাঁ দ্য ব্রাজা প্রমুখ অভিযাত্রী আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন।
তাদের ভ্রমণবৃত্তান্তের মাধ্যমে ইউরোপে আফ্রিকার ভূগোল ও সম্পদ সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে কঙ্গো অববাহিকা ও মধ্য আফ্রিকার সম্পদ ইউরোপীয় ব্যবসায়ী ও সরকারগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলে অভিযাত্রীদের অনুসন্ধান পরবর্তীকালে ব্যবসা, কূটনীতি ও উপনিবেশ স্থাপনের পথ সুগম করে।
তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ইউরোপীয় অভিযাত্রীরা কেবল উপনিবেশ স্থাপনের উদ্দেশ্যেই আফ্রিকায় গিয়েছিলেন—এমনটি সর্বক্ষেত্রে বলা যায় না। তাঁদের ভ্রমণের মধ্যে বৈজ্ঞানিক, ভৌগোলিক ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যও ছিল। কিন্তু তাঁদের সংগৃহীত তথ্য পরবর্তীকালে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো কাজে লাগায়।

২. খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যক্রম

আফ্রিকায় ইউরোপীয় প্রবেশের ক্ষেত্রে খ্রিস্টান মিশনারিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উনিশ শতকে বহু মিশনারি আফ্রিকায় গিয়ে ধর্মপ্রচার, বিদ্যালয় স্থাপন ও চিকিৎসাসেবার কাজ করেন। তাঁদের অনেকেই আফ্রিকার অভ্যন্তরীণ অঞ্চল সম্পর্কে ইউরোপে তথ্য পৌঁছে দেন।
মিশনারিদের কার্যক্রমের পেছনে ধর্মীয় উদ্দেশ্য থাকলেও তাঁদের প্রতিষ্ঠিত মিশন, বিদ্যালয় ও যোগাযোগকেন্দ্র অনেক ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের স্থায়ী উপস্থিতির ভিত্তি তৈরি করে। ধর্মপ্রচার ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরস্পরকে সহায়তা করেছে—এমন ধারণা সমসাময়িক ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী চিন্তায়ও দেখা যায়।
তবে আফ্রিকাকে এককভাবে “অসভ্য” বা “অন্ধকারাচ্ছন্ন” হিসেবে চিত্রিত করা ছিল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক মানসিকতার অংশ। আফ্রিকায় ইউরোপীয় আগমনের পূর্বেই বিভিন্ন অঞ্চলে সমৃদ্ধ রাজ্য, বাণিজ্যব্যবস্থা, নগরসভ্যতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান ছিল।

৩. শিল্পবিপ্লব ও কাঁচামালের প্রয়োজন

আফ্রিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল শিল্পবিপ্লব। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে ব্রিটেনে শুরু হওয়া শিল্পবিপ্লব উনিশ শতকে ইউরোপের অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। কারখানা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের প্রয়োজন দেখা দেয়।
আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে তামা, স্বর্ণ, হীরা, রাবার, হাতির দাঁত, কয়লা, পাম তেল ও অন্যান্য খনিজ ও কৃষিজ সম্পদ পাওয়া যেত। ফলে ইউরোপীয় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা আফ্রিকার সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট হন।
পরবর্তীকালে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের অর্থনৈতিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে খনিজ ও রপ্তানিমুখী পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। ফলে আফ্রিকা ইউরোপীয় শিল্প অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদভাণ্ডারে পরিণত হয়।

৪. উৎপাদিত পণ্যের নতুন বাজারের প্রয়োজন

শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপীয় কারখানায় বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদিত হতে থাকে। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এসব পণ্য বিক্রির জন্য নতুন বাজার প্রয়োজন হয়।
ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাই নিজেদের উপনিবেশগুলোকে একদিকে কাঁচামালের উৎস এবং অন্যদিকে উৎপাদিত পণ্যের বাজার হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। আফ্রিকার বিশাল জনসংখ্যা ও সম্ভাব্য বাজার ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করে।
অর্থনীতিবিদ জে. এ. হবসন তাঁর Imperialism: A Study গ্রন্থে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে ইউরোপীয় পুঁজিবাদী অর্থনীতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন। তাঁর ব্যাখ্যায় অতিরিক্ত পুঁজি ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সাম্রাজ্যবাদ বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল।

৫. অতিরিক্ত পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ

শিল্পবিপ্লবের ফলে ইউরোপে পুঁজির সঞ্চয় বৃদ্ধি পায়। শিল্পপতিরা নতুন নতুন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে অধিক মুনাফা অর্জন করতে চেয়েছিলেন। ইউরোপের তুলনায় আফ্রিকায় জমি, খনিজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ ছিল অনেক বেশি।
ফলে ইউরোপীয় কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা আফ্রিকায় খনি, রেলপথ, বন্দর, বাগান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়। উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তারা রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুবিধাও নিশ্চিত করতে পারত।

৬. ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ

উনিশ শতকে ইউরোপে জাতীয়তাবাদ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। জার্মানি ও ইতালির একীকরণের পর জাতীয় শক্তি ও মর্যাদা নিয়ে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও বৃদ্ধি পায়।
একটি রাষ্ট্রের যত বেশি উপনিবেশ, তত বেশি তার আন্তর্জাতিক মর্যাদা—এমন ধারণা ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তায় শক্তিশালী হয়। ফলে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম ও পর্তুগাল আফ্রিকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তারে প্রতিযোগিতায় নামে।
এই প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনৈতিক ছিল না; জাতীয় গৌরব ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে আফ্রিকা ইউরোপীয় শক্তিগুলোর জাতীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

৭. রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ

আফ্রিকার ভৌগোলিক অবস্থানও ইউরোপীয় শক্তিগুলোর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভূমধ্যসাগর, লোহিত সাগর, ভারত মহাসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে আফ্রিকার অবস্থান আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নৌ-যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
বিশেষ করে মিশর ও সুয়েজ খাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভারত ও পূর্বাঞ্চলীয় উপনিবেশের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষায় সুয়েজ পথের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তাই আফ্রিকার কিছু অঞ্চল দখল করা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামরিক ও কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

৮. ইউরোপীয় শক্তিসাম্য ও পারস্পরিক প্রতিযোগিতা

ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে Balance of Power বা শক্তিসাম্য নীতি অনুসরণ করত। কোনো একটি রাষ্ট্র যাতে অতিরিক্ত শক্তিশালী হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য অন্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করত।
আফ্রিকা দখলের ক্ষেত্রেও এই প্রতিযোগিতা কার্যকর ছিল। ব্রিটেন যদি কোনো অঞ্চল দখল করত, ফ্রান্স বা জার্মানি অন্য অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করত। ফলে একটি রাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী সম্প্রসারণ অন্য রাষ্ট্রের সম্প্রসারণকে উৎসাহিত করত।
এই প্রতিযোগিতাই শেষ পর্যন্ত আফ্রিকা দখলের জন্য এক ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করে।

৯. বার্লিন সম্মেলন ও আফ্রিকা দখলের আনুষ্ঠানিকতা

আফ্রিকা দখলের ইতিহাসে ১৮৮৪–৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। জার্মান চ্যান্সেলর অটো ফন বিসমার্কের উদ্যোগে ইউরোপীয় শক্তিগুলো আফ্রিকায় বাণিজ্য ও ভূখণ্ড দখলের বিভিন্ন নিয়ম নিয়ে আলোচনা করে।
সম্মেলনের সাধারণ আইনে কঙ্গো অববাহিকায় বাণিজ্যের স্বাধীনতা ও নৌচলাচলের বিষয়সহ বিভিন্ন নীতি নির্ধারিত হয়। একই সঙ্গে কোনো ইউরোপীয় শক্তি আফ্রিকার কোনো ভূখণ্ডে নতুন দাবি প্রতিষ্ঠা করলে কার্যকর দখল ও প্রশাসনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে শুধু উপকূল দখল করাই যথেষ্ট ছিল না; অভ্যন্তরীণ অঞ্চলেও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বার্লিন সম্মেলন সরাসরি আফ্রিকাকে ভাগ করে দেয়নি, কিন্তু এটি পরবর্তী Scramble for Africa-কে দ্রুততর করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি করে।

১০. উন্নত যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থা

শিল্পবিপ্লবের ফলে বাষ্পচালিত জাহাজ, রেলপথ, টেলিগ্রাফ ও আধুনিক অস্ত্র ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সাম্রাজ্য বিস্তারের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।
আগে আফ্রিকার অভ্যন্তরে প্রবেশ করা ইউরোপীয়দের জন্য কঠিন ছিল। কিন্তু বাষ্পচালিত নৌযান নদীপথে চলাচল সহজ করে এবং রেলপথ উপকূল থেকে অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে সৈন্য ও পণ্য পরিবহনে সহায়তা করে। টেলিগ্রাফ দ্রুত যোগাযোগের সুযোগ দেয়।
ফলে আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইউরোপীয় প্রশাসন ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা আগের তুলনায় সহজ হয়ে যায়।

১১. আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব

ইউরোপীয় সাম্রাজ্য বিস্তারে সামরিক প্রযুক্তির উন্নতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর হাতে ছিল উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র, দ্রুতগতির রাইফেল, মেশিনগান ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম।
অন্যদিকে আফ্রিকার বিভিন্ন রাষ্ট্রের সামরিক প্রযুক্তি সবসময় ইউরোপীয় শক্তির সমতুল্য ছিল না। ফলে ইউরোপীয় বাহিনী অনেক অঞ্চলে সামরিক সুবিধা অর্জন করতে সক্ষম হয়।
তবে আফ্রিকান জনগণ সর্বত্র বিনা প্রতিরোধে ইউরোপীয়দের মেনে নেয়নি। আশান্তি, জুলু, মাহদিস্ট সুদান, ইথিওপিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে ইউরোপীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ১৮৯৬ সালের আদওয়া যুদ্ধে ইথিওপিয়া ইতালিকে পরাজিত করে—যা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে আফ্রিকান প্রতিরোধের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

১২. দাসব্যবসা বিলোপের পর নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক

উনিশ শতকে আটলান্টিক দাসব্যবসা ধীরে ধীরে নিষিদ্ধ হওয়ার পর ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের ধরন পরিবর্তিত হতে থাকে। দাস বাণিজ্যের পরিবর্তে “Legitimate Commerce” বা বৈধ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।
পাম তেল, রাবার, হাতির দাঁত, স্বর্ণসহ বিভিন্ন পণ্য ইউরোপীয় বাজারে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধীরে ধীরে ইউরোপীয় ব্যবসায়ী, কোম্পানি, মিশনারি ও সরকারি প্রতিনিধিদের আফ্রিকার অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ওপর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।

১৩. আফ্রিকার রাজনৈতিক বিভাজন ও ইউরোপীয় হস্তক্ষেপ

ঔপনিবেশিক যুগের আগে আফ্রিকা কোনো একক রাজনৈতিক রাষ্ট্র ছিল না। মহাদেশজুড়ে বিভিন্ন রাজ্য, সাম্রাজ্য, নগররাষ্ট্র ও স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। তাদের মধ্যে অনেক সময় রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকত।
ইউরোপীয় শক্তিগুলো কখনও স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে চুক্তি, কখনও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং কখনও সামরিক শক্তি ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বাড়ায়। বিভিন্ন স্থানীয় বিরোধকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব বিস্তার করতে সক্ষম হয়।
তবে আফ্রিকার রাজনৈতিক বিভাজনকে ইউরোপীয় দখলের একমাত্র কারণ বলা ঠিক নয়। ইউরোপীয় সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত শক্তিই ছিল এ প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান বাহ্যিক চালিকা শক্তি।

১৪. আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ ও খনিজ সম্পদের আকর্ষণ

আফ্রিকার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ ইউরোপীয় শক্তিগুলোর কাছে বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে। দক্ষিণ আফ্রিকার স্বর্ণ ও হীরা, মধ্য আফ্রিকার তামা ও রাবার, পশ্চিম আফ্রিকার পাম তেল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য ইউরোপীয় বাণিজ্যিক স্বার্থকে শক্তিশালী করে।
পরবর্তীকালে খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন ইউরোপীয় কোম্পানি ও রাষ্ট্র আফ্রিকার ভূখণ্ড দখলে প্রতিযোগিতা করে। এভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ আফ্রিকাকে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করে।

১৫. সভ্যতা বিস্তারের ধারণা ও বর্ণবাদী মানসিকতা

উনিশ শতকের ইউরোপে একটি ধারণা জনপ্রিয় হয়েছিল যে ইউরোপীয় সভ্যতা অন্যান্য সমাজের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় “Civilizing Mission” বা তথাকথিত সভ্যতা প্রদানের ধারণা। ইউরোপীয়রা দাবি করত যে তারা শিক্ষা, খ্রিস্টধর্ম, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশাসন আফ্রিকায় নিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু এই ধারণার আড়ালে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করেছিল। ইউরোপীয় শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা উপনিবেশ স্থাপনকে নৈতিকভাবে বৈধ হিসেবে উপস্থাপনে সাহায্য করে। আধুনিক ইতিহাসবিদরা তাই এই ধরনের বক্তব্যকে ঔপনিবেশিক মতাদর্শের অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করেন।


আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতার ফল

উপরোক্ত কারণগুলো একত্রিত হয়ে আফ্রিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের পরিবেশ সৃষ্টি করে। ১৮৮০-এর দশক থেকে দখলের প্রতিযোগিতা দ্রুত বাড়তে থাকে। ব্রিটেন ও ফ্রান্স সবচেয়ে বিস্তৃত ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে নেয়। এছাড়া জার্মানি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালিও আফ্রিকায় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে।

এই প্রক্রিয়ায় আফ্রিকার রাজনৈতিক সীমানা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয় এবং ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভিন্ন কূটনৈতিক বিরোধ সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে আফ্রিকার অর্থনীতি ক্রমে ইউরোপীয় বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্গঠিত হয়। রেলপথ, বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থা নির্মিত হলেও সেগুলোর বড় অংশই উপনিবেশিক বাণিজ্য ও সম্পদ আহরণের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল।।



পরিশেষে বলা যায়, আফ্রিকায় ইউরোপীয় শক্তিবর্গের আগমন ছিল বহুমাত্রিক একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। শিল্পবিপ্লব ইউরোপের কাঁচামাল ও বাজারের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়; অতিরিক্ত পুঁজি নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুঁজতে থাকে; জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা রাষ্ট্রগুলোকে সাম্রাজ্য বিস্তারে উৎসাহিত করে; মিশনারি ও অভিযাত্রীদের কার্যক্রম আফ্রিকা সম্পর্কে ইউরোপীয় জ্ঞান বাড়ায়; আর উন্নত পরিবহন, যোগাযোগ ও সামরিক প্রযুক্তি দখলকে বাস্তবায়ন করা সহজ করে।
১৮৮৪–৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলন এই প্রতিযোগিতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে এবং পরবর্তী সময়ে আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চল ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তবে আফ্রিকান সমাজগুলো নিছক নিষ্ক্রিয় ছিল না; বিভিন্ন অঞ্চলে তারা সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
অতএব, আফ্রিকায় ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জাতীয়তাবাদ, কৌশলগত প্রয়োজন ও ঔপনিবেশিক মতাদর্শ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এই প্রতিযোগিতাই উনিশ শতকের শেষভাগে আফ্রিকার ইতিহাসে এক গভীর পরিবর্তন ঘটায়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
🔥 SPECIAL OFFER Daraz Affiliate
-0%
DARAZ DEAL

Product Title

৳৳0 ৳৳0

Product Description

🛒 এখনই কিনুন
⬇ Download কালকথা apk
কালকথা © 2026 | সকল স্বত্ব সংরক্ষিত