![]() |
| চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও এর দোষ-গুণ |
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কী?
চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পটভূমি
১. কোম্পানির নিশ্চিত রাজস্বের প্রয়োজন
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মূলত একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হলেও বাংলায় রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের পর তাকে প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হয়। তাই নিয়মিত ও পূর্বানুমেয় রাজস্ব আয় নিশ্চিত করা কোম্পানির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
২. পূর্ববর্তী রাজস্ব ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা
কোম্পানির শাসনের প্রথমদিকে বিভিন্ন ধরনের রাজস্ব বন্দোবস্তের পরীক্ষা চালানো হয়। বারবার পরিবর্তনের ফলে কৃষক ও জমিদার উভয়ের মধ্যেই অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। তাই একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
৩. জমিদার শ্রেণিকে কোম্পানির অনুগত করা
কোম্পানি মনে করেছিল, জমিদারদের ভূমির ওপর স্থায়ী স্বত্ব দিলে তারা নিজেদের সম্পত্তির উন্নতি করবে এবং ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত থাকবে।
৪. কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির প্রত্যাশা
ব্রিটিশ নীতিনির্ধারকদের ধারণা ছিল, জমিদাররা যদি স্থায়ীভাবে জমির সঙ্গে যুক্ত হন, তাহলে তারা কৃষি ও ভূমির উন্নয়নে বিনিয়োগ করবেন। এর ফলে উৎপাদন বাড়বে এবং পরোক্ষভাবে অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
৫. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধারণার পূর্বসূত্র
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধারণা একেবারে নতুন ছিল না। স্যার ফিলিপ ফ্রান্সিস ১৭৭৬ সালে বাংলার ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্থায়ী বন্দোবস্তের ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীকালে ১৭৮৯–৯০ সালের দশশালা বন্দোবস্তের অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কার্যকর হয়।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রধান বৈশিষ্ট্য
১. রাজস্ব স্থায়ীভাবে নির্ধারণ
এই ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল সরকারের প্রাপ্য ভূমি রাজস্বের পরিমাণ স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করা। ভবিষ্যতে জমির উৎপাদন বা মূল্য বৃদ্ধি পেলেও সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব সাধারণভাবে বাড়ানো হবে না।
২. জমিদারদের স্বত্বের স্বীকৃতি
জমিদারদের জমির ওপর উত্তরাধিকারযোগ্য ও হস্তান্তরযোগ্য স্বত্ব স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ফলে জমিদারি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূসম্পত্তি হিসেবে গড়ে ওঠে।
৩. সরকারের সঙ্গে জমিদারের সরাসরি সম্পর্ক
সরকার সাধারণত জমিদারদের কাছ থেকেই নির্ধারিত রাজস্ব আদায় করত। জমিদাররা আবার তাঁদের অধীনস্থ রায়তদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করতেন।
৪. নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব প্রদান
জমিদারদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের রাজস্ব পরিশোধ করতে হতো। নির্ধারিত সময়ে রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হলে জমিদারি নিলামে বিক্রি করার ব্যবস্থা ছিল। এই কঠোর নিয়মই পরবর্তীকালে ‘সূর্যাস্ত আইন’ নামে পরিচিত হয়।
৫. রায়তদের অবস্থান
রায়তরা ছিল প্রকৃত কৃষি উৎপাদনকারী। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে তাদের স্বার্থ জমিদারদের মতো শক্তিশালীভাবে সুরক্ষিত হয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের গুণ বা ইতিবাচক দিক
১. সরকারের রাজস্ব আয় সম্পর্কে নিশ্চয়তা
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কোম্পানি তার ভূমি রাজস্বের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে। ফলে প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যয়ের জন্য বার্ষিক বাজেট তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হয়। রাজস্ব প্রশাসনও একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আসে।
২. রাজস্ব প্রশাসনে স্থায়িত্ব
এর আগে রাজস্ব ব্যবস্থায় বারবার পরিবর্তন ঘটত। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে রাজস্ব নির্ধারণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৯৩ সালের কর্নওয়ালিস কোডের মাধ্যমে রাজস্ব প্রশাসনেও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা হয় এবং বোর্ড অব রেভিনিউ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৩. জমিদার শ্রেণির উত্থান
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে একটি শক্তিশালী জমিদার শ্রেণি গড়ে ওঠে। এই শ্রেণি পরবর্তী ঔপনিবেশিক সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৪. জমির উন্নয়নের সম্ভাবনা সৃষ্টি
তাত্ত্বিকভাবে জমিদারদের স্বত্ব স্থায়ী হওয়ায় তাদের জমির উন্নয়নে বিনিয়োগ করার উৎসাহ পাওয়ার কথা ছিল। কারণ জমির উৎপাদন বাড়লে সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব অপরিবর্তিত থাকলেও জমিদারের আয় বাড়তে পারত।
৫. ভূমির বাজার সৃষ্টি
জমিদারি স্বত্ব হস্তান্তরযোগ্য হওয়ায় ভূমি ক্রয়-বিক্রয়ের একটি নতুন বাজার গড়ে ওঠে। ফলে পুরনো জমিদারদের পাশাপাশি নতুন জমিদার ও ভূস্বামী শ্রেণির উত্থান ঘটে।
৬. প্রশাসনিক ব্যয় হ্রাস
কোম্পানি প্রত্যেক কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি রাজস্ব আদায় না করে জমিদারদের মাধ্যমে রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারত। ফলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সরকারের প্রত্যক্ষ প্রশাসনিক ব্যয় ও দায়িত্ব কমে যায়।
৭. মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির বিকাশ
পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধরনের তালুক ও মধ্যস্বত্ব গড়ে ওঠে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে অনেক তালুককে স্বাধীন রাজস্ব-প্রদানকারী জমিদারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দোষ বা নেতিবাচক দিক
১. কৃষকদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়
২. জমিদারদের অত্যাচার
অনেক জমিদার নির্ধারিত রাজস্বের পাশাপাশি কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত আদায় করতেন। খাজনা দিতে ব্যর্থ হলে কৃষক উচ্ছেদ বা অন্যান্য চাপের মুখে পড়তে পারত।
৩. সূর্যাস্ত আইনের কঠোরতা
নির্ধারিত সময়ে রাজস্ব পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে জমিদারি নিলামে বিক্রি হয়ে যেতে পারত। ফলে বহু পুরনো জমিদার তাদের সম্পত্তি হারান। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বন্দোবস্তের পর প্রথম কয়েক দশকে অতিরিক্ত রাজস্ব নির্ধারণ ও রাজস্ব পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জমিদারি বিক্রি হয়।
৪. নতুন জমিদার শ্রেণির সৃষ্টি
পুরনো জমিদারদের অনেকেই জমিদারি হারালে নিলামের মাধ্যমে নতুন ব্যক্তিরা জমিদারি কিনে নেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী জমিদার শ্রেণির পাশাপাশি ব্যবসায়ী, মহাজন ও অন্যান্য ধনী ব্যক্তিরাও জমিদারিতে প্রবেশের সুযোগ পায়।
৫. জমিদারদের অনুপস্থিতিবাদ
অনেক নতুন জমিদার নিজের জমিদারিতে বসবাস করতেন না। তারা শহরে বসবাস করে কর্মচারী বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে খাজনা আদায় করতেন। ফলে কৃষক ও জমিদারের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
৬. মধ্যস্বত্বভোগীর বিস্তার
জমিদারদের পাশাপাশি তালুকদার, পত্তনিদারসহ বিভিন্ন ধরনের মধ্যস্বত্বভোগীর বিস্তার ঘটে। এর ফলে কৃষককে অনেক সময় একাধিক স্তরের খাজনা ও দাবির মুখোমুখি হতে হতো।
৭. কৃষি উন্নয়নের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল জমিদারদের কৃষি উন্নয়নে উৎসাহিত করা। কিন্তু বাস্তবে সব জমিদার কৃষি উন্নয়নে বিনিয়োগ করেননি। অনেকের কাছে দ্রুত খাজনা আদায় করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে।
৮. সরকারের সম্ভাব্য অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ নষ্ট
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমির উৎপাদন ও মূল্য ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পেলেও সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব একই থাকত। ফলে কৃষি ও জমির মূল্য বৃদ্ধি থেকে যে অতিরিক্ত অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি হয়েছিল, তার বড় অংশ সরকার সরাসরি রাজস্ব হিসেবে পায়নি।
৯. রাজস্ব নির্ধারণে তথ্যের ঘাটতি
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগে বাংলার ভূমির উৎপাদন ক্ষমতা, জমির প্রকৃতি ও প্রকৃত আয়ের বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল কি না—এ নিয়ে সমকালেই বিতর্ক ছিল। জন শোর মনে করতেন, দেশের সম্পদ ও জমির উৎপাদন ক্ষমতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ছাড়া স্থায়ী রাজস্ব নির্ধারণ করা উচিত নয়।
১০. গ্রামীণ সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি
এই ব্যবস্থার ফলে জমিদার ও সাধারণ কৃষকের মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবধান বৃদ্ধি পায়। ভূমির ওপর নিয়ন্ত্রণকারী শ্রেণি এবং প্রকৃত উৎপাদনকারী কৃষকের মধ্যে একটি স্পষ্ট সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভাজন তৈরি হয়।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সামগ্রিক প্রভাব
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে ব্রিটিশ ভারতের ভূমি রাজস্ব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ বলা যায়। এর মাধ্যমে—
- ব্রিটিশ সরকার ও জমিদারদের মধ্যে স্থায়ী রাজস্ব সম্পর্ক তৈরি হয়।
- জমিদারি স্বত্বের নতুন আইনি কাঠামো গড়ে ওঠে।
- বাংলায় নতুন ভূস্বামী ও মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণির বিকাশ ঘটে।
- কৃষক ও জমিদারের সম্পর্ক নতুন রূপ লাভ করে।
- ভূমি ক্রয়-বিক্রয় ও জমিদারি নিলামের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
- ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রশাসন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
তবে এর ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু কোম্পানির রাজস্ব-নিশ্চয়তার দিক দেখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। কৃষকের অধিকার, গ্রামীণ বৈষম্য এবং ভূমি সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনও বিবেচনা করতে হয়।
