উনিশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপীয় দেশগুলো আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে নেয়। এরপর দীর্ঘদিন তারা আফ্রিকার দেশগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো শাসন ও শোষণ করে। একসময় ইউরোপীয়দের শোষণ ও অত্যাচার বেড়ে গেলে আফ্রিকার মানুষ জাতীয়তাবাদী চেতনায় জেগে ওঠে এবং স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন শুরু করে। ধীরে ধীরে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর আফ্রিকার দেশগুলো নিজেরাই শাসনকার্য পরিচালনা শুরু করে। কিন্তু নতুন রাষ্ট্রগুলো বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়। নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ ও বিরোধ দেখা দেয়। ফলে আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য ছিল না এবং তাদের স্বাধীনতাও বিভিন্নভাবে হুমকির মুখে পড়ে। আফ্রিকার নেতারা আশা করেছিলেন যে জাতিসংঘে তারা আফ্রিকার সব দেশের হয়ে একসঙ্গে কথা বলবেন। কিন্তু জাতিসংঘের বিভিন্ন বিষয়েও আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে মতের মিল ছিল না। তাই আফ্রিকার দেশগুলো বুঝতে পারে যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা ও সমস্যার সমাধানের জন্য তাদের মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন। এই প্রয়োজন থেকেই ১৯৬৩ সালে আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা বা OAU গঠিত হয়।
আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা গঠনের পটভূমি
কোনো সংগঠন হঠাৎ করে গড়ে ওঠে না। আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা গঠনের পেছনেও অনেক ঘটনা ও কারণ ছিল। বিভিন্ন উদ্যোগ ও ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টার মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা গঠনের পথ তৈরি হয়। নিচে এর প্রধান কারণগুলো সহজভাবে আলোচনা করা হলো।আফ্রিকান নেতৃবৃন্দের মধ্যে মতপার্থক্য ও সংশয়
দীর্ঘদিন আন্দোলন করার পর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ইউরোপীয় উপনিবেশ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর এসব দেশের নেতারা দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। একই সময়ে অনেক দেশ স্বাধীন হওয়ায় এবং তাদের শাসন পরিচালনার অভিজ্ঞতা কম থাকায় নেতাদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে চিন্তা ও সন্দেহ তৈরি হয়।তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ এবং আফ্রিকার সামগ্রিক স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করতে পারছিলেন না। তাই একটি সংগঠন গড়ে তুলে সবাইকে একত্র করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে ঘানার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ড. কোয়ামে নক্রুমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি আফ্রিকার দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। যদিও তাঁর প্রথম উদ্যোগ সফল হয়নি।
পান-আফ্রিকান ফ্রিডম মুভমেন্ট অব ইস্ট অ্যান্ড সেন্ট্রাল আফ্রিকা
ব্রিটিশ শাসিত পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন উপনিবেশের জাতীয়তাবাদী নেতারা নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে আগ্রহী ছিলেন। তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে একসঙ্গে কাজ করলে স্বাধীনতা অর্জন এবং নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরও শক্তিশালী হবে।১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে তাঞ্জানিয়ায় এ ধরনের ঐক্যের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই সংগঠন ও আন্দোলন আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ঐক্যের ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।
মালি ফেডারেশন
আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চেষ্টা ছিল মালি ফেডারেশন। স্বাধীনতা লাভের আগেই সেনেগাল, সুদান, দাহোমি ও ভোল্টার জাতীয় পরিষদের সদস্যরা স্বাধীনতার পর নিজেদের মধ্যে একটি ফেডারেল ঐক্য গড়ে তোলার পক্ষে মত দেন।কিন্তু ফরাসিদের চাপের কারণে দাহোমি ও ভোল্টা এই পরিকল্পনা থেকে সরে যায়। পরে সুদান ও সেনেগাল মিলে ১৯৫৯ সালে রিপাবলিকান মালি নামে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র গঠন করে। কিন্তু দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতভেদ থাকায় ১৯৬০ সালে মালি ফেডারেশন ভেঙে যায়।
ঘানা-গিনি ইউনিয়ন গঠন
১৯৫৭ সালে ঘানা স্বাধীনতা লাভ করে। ঘানার নেতা ড. কোয়ামে নক্রুমা আফ্রিকার দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার ধারণাকে জোরালোভাবে সমর্থন করেন। তিনি মনে করতেন, শুধু ঘানা স্বাধীন হলেই হবে না; পুরো আফ্রিকা স্বাধীন না হলে ঘানার স্বাধীনতা পুরোপুরি অর্থবহ হবে না।১৯৫৮ সালে গিনি স্বাধীনতা লাভ করার পর গিনির নেতা আহমেদ সেকুতুরে ও ড. নক্রুমা একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের উদ্যোগে ঘানা-গিনি ইউনিয়ন গঠিত হয়। এই ইউনিয়ন পরবর্তীতে আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা গঠনের পথ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্রাজাভিল গ্রুপের ভূমিকা
ব্রাজাভিল গ্রুপ গঠিত হয়েছিল সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলোর কয়েকটি দেশকে নিয়ে। এর নেতৃত্বে ছিলেন আইভরিকোস্টের প্রেসিডেন্ট হাউফোয়েট বায়োগানি।১৯৬০ সালে ব্রাজাভিলে আফ্রো-মালাগাছি ইউনিয়ন নামে এই সংগঠন গঠিত হয়। এর সদস্য ছিল আইভরিকোস্ট, দাহোমি, নাইজার ও আপার ভোল্টা। এই সংগঠনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বিভিন্ন বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা।
কাসাব্লাঙ্কা গ্রুপের ভূমিকা
১৯৬১ সালের জানুয়ারিতে মিশর, ঘানা, গিনি, মালি ও মরক্কোর রাষ্ট্রপ্রধান এবং আলজেরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে কাসাব্লাঙ্কা গ্রুপ গঠিত হয়।এই গ্রুপের প্রধান লক্ষ্য ছিল আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন বাণিজ্য ও ডাক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং একসঙ্গে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে কাজ করা। আফ্রিকার দেশগুলোকে একত্র করার ক্ষেত্রে এই গ্রুপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মনরোভিয়া গ্রুপের ভূমিকা
১৯৬১ সালের মে মাসে লাইবেরিয়া, নাইজেরিয়া ও টোগোর নেতৃত্বে মনরোভিয়া গ্রুপ গড়ে ওঠে। এই গ্রুপের দেশগুলোও নিজেদের মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করে।ব্রাজাভিল গ্রুপ, কাসাব্লাঙ্কা গ্রুপ এবং মনরোভিয়া গ্রুপের মধ্যে ধীরে ধীরে আলোচনা ও সমঝোতা তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের নেতারা একটি বড় ও ঐক্যবদ্ধ সংগঠন গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। এর ফলেই আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা বা OAU গঠনের পথ তৈরি হয়।
উপরের আলোচনা থেকে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নানা সমস্যা ও মতভেদ দেখা দেয়। এসব সমস্যা সমাধান এবং আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার জন্য নেতারা বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেন। ঘানা-গিনি ইউনিয়ন, মালি ফেডারেশন, ব্রাজাভিল গ্রুপ, কাসাব্লাঙ্কা গ্রুপ ও মনরোভিয়া গ্রুপসহ বিভিন্ন উদ্যোগ আফ্রিকান ঐক্যের পথ তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য, সহযোগিতা এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজন থেকেই আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা (OAU) গঠিত হয়। আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য, সহযোগিতা এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজন থেকেই আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা (OAU) গঠিত হয়। আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
Tags:
আফ্রিকার ইতিহাস
