১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুধু একটি দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না; এটি তৎকালীন শীতল যুদ্ধের আন্তর্জাতিক রাজনীতি, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি এবং পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিল। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দাবি দমন করতে ২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হয়। পরবর্তীতে প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয় এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক ক্রমশ সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়।
এই পরিস্থিতিতে বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর অবস্থান এক ছিল না। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা প্রদান করে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে মূলত পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে কংগ্রেসের কিছু সদস্য, সাংবাদিক, কূটনীতিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি উল্লেখযোগ্য সহানুভূতিও গড়ে উঠেছিল। ফলে মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক দিকটি ছিল অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক।
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতি বুঝতে হলে তৎকালীন শীতল যুদ্ধের রাজনীতি বিবেচনা করা জরুরি। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে পাকিস্তান ছিল গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অংশীদার। একই সময়ে পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপনের পথ তৈরি করছিল। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের সংকটে মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান পাকিস্তানের প্রতি তুলনামূলকভাবে অনুকূল হয়ে ওঠে। মার্কিন সরকারি নথিতেও পরবর্তীকালে এই নীতিকে পাকিস্তানের দিকে “tilt” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
প্রথম পর্যায়: মার্চ–জুন ১৯৭১
২৫ মার্চের সামরিক অভিযান ও ব্যাপক সহিংসতার পরও মার্কিন প্রশাসন প্রথম দিকে সংকটটিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখায়। তবে ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত কেনেথ কিটিং পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেন এবং পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের মানবিক পরিণতি তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় মানবিক সহায়তা দেয়। মার্কিন সরকারি নথিতে পরবর্তীকালে উল্লেখ করা হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ ও ভারতীয় শরণার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য ত্রাণ সহায়তা প্রদান করেছিল।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়
জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ প্রতিরোধ এবং পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা। মার্কিন প্রশাসন শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি এবং রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়েও চিন্তা করেছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক অবস্থান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবির কারণে এই ধরনের সমাধান বাস্তবায়িত হয়নি।
চূড়ান্ত পর্যায়
৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের প্রতি আরও সক্রিয় কূটনৈতিক সমর্থন প্রদর্শন করে। বঙ্গোপসাগরে মার্কিন সপ্তম নৌবহরের টাস্কফোর্স ৭৪-এর অংশ হিসেবে USS Enterprise পাঠানো হয়। মার্কিন সরকারি নথি অনুযায়ী, এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ভারতকে সামরিকভাবে সংযত রাখার বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা শুধু সরকারি নীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশটির বহু সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, কংগ্রেস সদস্য ও সাধারণ নাগরিক বাংলাদেশের জনগণের দুর্দশার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে. ব্লাড-এর নেতৃত্বাধীন ঢাকার মার্কিন কূটনীতিকদের একটি অংশও পাকিস্তানি বাহিনীর দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ প্রতিবাদ জানিয়েছিল। একই সময়ে জর্জ হ্যারিসন ও রবিশঙ্করের “Concert for Bangladesh” আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূমিকা রাখে।
২. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোভিয়েত নীতির পেছনে মানবিক বিবেচনার পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন-চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের ভারসাম্য এবং ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কও কাজ করেছিল।
১৯৭১ সালের ২ এপ্রিল সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে চিঠি দিয়ে রক্তপাত বন্ধ এবং রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান। সোভিয়েত নেতৃত্ব নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিল।
ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি
১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শান্তি, মৈত্রী ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। এর ফলে ভারত কূটনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী অবস্থানে আসে এবং চীন বা অন্য কোনো শক্তির সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে সোভিয়েত সমর্থনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিশ্চয়তা পায়। মার্কিন নথিতেও ভারত-সোভিয়েত সম্পর্ককে ১৯৭১ সালের সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উপাদান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘে সোভিয়েত ভূমিকা
ডিসেম্বরে যুদ্ধ শুরু হলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের বিভিন্ন প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এমন প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ভেটো ব্যবহার করে, কারণ তাদের মতে শুধু যুদ্ধবিরতি চাপিয়ে দিলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না। জাতিসংঘের নথিতেও ডিসেম্বরের আলোচনায় সোভিয়েত অবস্থানের এই দিকটি প্রতিফলিত হয়েছে।
এই কূটনৈতিক অবস্থান ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীকে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়। ফলে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে পারে।
সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তীতে ২৪ জানুয়ারি ১৯৭২ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের পুনর্গঠনেও সহযোগিতা করে। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রেও সোভিয়েত ইউনিয়ন সক্রিয় সমর্থন দেয়।
৩. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে চীনের ভূমিকা
১৯৭১ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীন পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল। চীন তখন ভারতকে তার আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখত এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় ছিল। পাকিস্তানও চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছিল। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে চীন পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নেয়।
২৫ মার্চের সামরিক অভিযান সম্পর্কে চীন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেনি। বরং পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখে। মার্কিন সরকারি নথিতেও চীনের পাকিস্তানপন্থী অবস্থান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকে সে সময়ের চীন-ভারত ও চীন-সোভিয়েত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর চীন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করে। তবে চীন সরাসরি সামরিকভাবে যুদ্ধে প্রবেশ করেনি। এর পেছনে ভারতের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত, সোভিয়েত প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা এবং তৎকালীন সামরিক-কৌশলগত পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মার্কিন নথিতে চীনের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের উদ্বেগের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও চীন দ্রুত স্বীকৃতি দেয়নি। ৪ অক্টোবর ১৯৭৫ চীন বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। পরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়।
৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের ভূমিকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা ছিল বহুমাত্রিক—রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, মানবিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক। ২৫ মার্চের পর বিপুলসংখ্যক মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে শুরু করলে ভারত একটি বড় মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়।
শরণার্থীদের আশ্রয়
১৯৭১ সালে প্রায় এক কোটি মানুষ বাংলাদেশ থেকে ভারতে আশ্রয় নেয়। ভারত তাদের জন্য শরণার্থী শিবির, খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তার ব্যবস্থা করে। এই বিপুল শরণার্থী প্রবাহ ভারতীয় অর্থনীতি ও প্রশাসনের ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসার অন্যতম কারণ ছিল এই শরণার্থী সংকট।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ
ভারতীয় ভূখণ্ডে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত করার সুযোগ তৈরি হয়। বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় প্রশিক্ষণ শিবির গড়ে ওঠে এবং মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র, সামরিক প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য সহযোগিতা লাভ করেন। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারও ভারতের ভূখণ্ডে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পায়।
আন্তর্জাতিক জনমত গঠন
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিভিন্ন দেশে সফর করে বাংলাদেশের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক নেতাদের কাছে তুলে ধরেন। ভারত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান এবং বাংলাদেশের জনগণের অধিকার স্বীকার করার আহ্বান জানায়।
সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ
৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর পর ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে প্রবেশ করে। এর আগে ভারত মুক্তিবাহিনীকে সহযোগিতা করলেও এই পর্যায়ে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়।
৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। এরপর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী সমন্বিতভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। স্থল, নৌ ও বিমান—তিন বাহিনীর সমন্বিত অভিযান দ্রুত অগ্রসর হয়। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।
৫. জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভূমিকা
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি ও রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর কারণে এমন কিছু উদ্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়নি, যেগুলো যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করতে পারত। জাতিসংঘের ১৯৭১ সালের নথিতে দেখা যায়, ডিসেম্বরের নিরাপত্তা পরিষদে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক সমাধানের প্রশ্নটি বিভিন্ন দেশের বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, চীন পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ প্রক্রিয়ায়ও বিরোধিতা করে এবং ১৯৭২ সালের আবেদন নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ব্যবহার করে। মার্কিন নথিতে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে চীনের ভেটো নিশ্চিত করার কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে।
৬. বৃহৎ শক্তিগুলোর অবস্থানের তুলনামূলক চিত্র
| দেশ | ১৯৭১ সালে প্রধান অবস্থান | গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা |
|---|
| ভারত | বাংলাদেশের পক্ষে | শরণার্থী আশ্রয়, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা |
| সোভিয়েত ইউনিয়ন | বাংলাদেশ ও ভারতের পক্ষে | কূটনৈতিক সমর্থন, ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী, জাতিসংঘে ভেটো |
| মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | সরকারি পর্যায়ে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকে ছিল | পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক, যুদ্ধের সময় নৌবহর মোতায়েন; পাশাপাশি শরণার্থী ত্রাণে সহায়তা |
| চীন | পাকিস্তানের পক্ষে | পাকিস্তানের রাজনৈতিক সমর্থন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিরোধিতা |
| জাতিসংঘ | বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভিন্ন অবস্থান | যুদ্ধবিরতি, শরণার্থী ও রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা |
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় ছিল মূলত বাংলাদেশের জনগণ, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দীর্ঘ সংগ্রামের ফল। তবে আন্তর্জাতিক পরিবেশও যুদ্ধের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, শরণার্থী সহায়তা, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং শেষ পর্যায়ে সরাসরি সামরিক সহযোগিতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে কূটনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থন দেয় এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এমন অবস্থান গ্রহণ করে যা যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশের পক্ষে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে।
অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তৎকালীন ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থান বজায় রাখে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সরকারি নীতির বিপরীতে বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর ভূমিকা ছিল। ফলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়; এটি একই সঙ্গে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম, মানবিক সংকট এবং শীতল যুদ্ধের আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশের বিজয় শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র পরিবর্তন করে এবং ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।