সমতট ছিল প্রাচীন বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এটি মূলত বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ছিল এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঐতিহাসিকদের মতে, বর্তমান কুমিল্লা, নোয়াখালী ও পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্রাচীন সমতটের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে বিভিন্ন সময়ে এর সীমানা পরিবর্তিত হয়েছে।
‘সমতট’ নামের অর্থ সাধারণভাবে সমতল ভূমি বা সমতল উপকূলীয় অঞ্চল। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ অঞ্চলের মাটি ছিল তুলনামূলকভাবে উর্বর এবং কৃষিকাজের জন্য উপযোগী। নদী ও জলপথের বিস্তারের ফলে কৃষির পাশাপাশি নৌ-বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থাও বিকশিত হয়। সমতটের মাধ্যমে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোর যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল।
প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য, শিলালিপি ও চীনা পর্যটকদের বিবরণে সমতটের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষ করে চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ সমতট সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। গুপ্ত-পরবর্তী যুগে সমতটে বিভিন্ন স্থানীয় রাজবংশের উত্থান ঘটে। খড়্গ, দেব ও চন্দ্র রাজবংশের শাসনের সঙ্গে সমতটের ইতিহাস ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
ধর্ম ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও সমতট ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে এবং বহু বৌদ্ধবিহার ও শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে। পাশাপাশি হিন্দুধর্মেরও প্রভাব ছিল। ফলে সমতট প্রাচীন বাংলার একটি সমৃদ্ধ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জনপদ হিসেবে ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে।
 |
| সমতট জনপদ |
সমতট নামের অর্থ
‘সমতট’ নামটি প্রাচীন বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও জনপদীয় পরিচয় বহন করে। ‘সমতট’ শব্দটি সাধারণভাবে সমতল ভূমি বা সমতল উপকূলীয় অঞ্চল অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘সম’ অর্থ সমতল এবং ‘তট’ অর্থ তীর বা উপকূল—এই অর্থগত ব্যাখ্যা থেকে ধারণা করা হয় যে, নামটির সঙ্গে এ অঞ্চলের সমতল ও নদী-সমুদ্রসংলগ্ন ভূপ্রকৃতির সম্পর্ক ছিল।
প্রাচীন সমতট মূলত বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ছিল। এ অঞ্চলের বিস্তীর্ণ অংশ নদী, জলাভূমি ও সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ায় ভূমি ছিল তুলনামূলকভাবে নিচু ও সমতল। বিভিন্ন নদীর প্রবাহের মাধ্যমে বহন করে আনা পলি জমে এখানকার মাটি উর্বর হয়ে উঠেছিল। ফলে ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য অঞ্চলটি বেশ উপযোগী ছিল।
ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সমতটের মানুষের জীবন ও অর্থনীতিতে নদী ও জলপথের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। কৃষির পাশাপাশি মৎস্য আহরণ, নৌযান চলাচল ও বাণিজ্যও বিকশিত হয়। নদীপথে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য এলাকার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল।
অতএব, ‘সমতট’ নামটি শুধু একটি প্রাচীন জনপদের নাম নয়; বরং এর ভূপ্রকৃতি, নদী-সমুদ্রসংলগ্ন অবস্থান এবং উর্বর সমতল ভূমির বৈশিষ্ট্যকেও প্রকাশ করে। এজন্য প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে সমতটের নাম ও ভৌগোলিক পরিচয় বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
ভৌগোলিক অবস্থান
প্রাচীন সমতট জনপদ বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ ছিল। এর মূল কেন্দ্র বর্তমান কুমিল্লা অঞ্চলের আশপাশে ছিল বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা। তবে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন, নতুন রাজবংশের উত্থান এবং প্রশাসনিক পুনর্গঠনের কারণে সমতটের সীমানা ও বিস্তৃতি পরিবর্তিত হয়েছে।
বর্তমান ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করলে সমতটের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চলের মধ্যে কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী এবং চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কিছু অংশ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া এর বিস্তৃতি পার্শ্ববর্তী দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আরও কিছু এলাকায় ছড়িয়ে ছিল বলে ধারণা করা হয়। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পূর্বদিকে পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল থাকায় সমতটের ভৌগোলিক অবস্থান ছিল কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সমতটের ভূপ্রকৃতি ছিল মূলত নদীবিধৌত সমতল ও উর্বর। মেঘনা ও এর বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা এবং অন্যান্য নদ-নদীর মাধ্যমে পলি জমে এখানকার ভূমি কৃষির জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে। ফলে ধান ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। নদীপথের কারণে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও নৌ-বাণিজ্যও সহজতর হয়েছিল।
এই ভৌগোলিক অবস্থান সমতটকে শুধু কৃষির জন্য নয়, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছিল। পরবর্তীকালে কুমিল্লা অঞ্চলের ময়নামতি ও লালমাই এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন প্রত্নস্থল সমতটের সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।
রাজনৈতিক ইতিহাস
প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে সমতট জনপদ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় অবস্থিত হওয়ায় এই অঞ্চল দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন রাজবংশের উত্থান-পতনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বিভিন্ন সময়ে সমতট কখনো স্বাধীন, আবার কখনো বৃহত্তর সাম্রাজ্যের অধীনস্থ বা আধা-স্বাধীন রাজ্য হিসেবে অস্তিত্ব বজায় রাখে। এর রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে তথ্য প্রধানত তাম্রশাসন, শিলালিপি, মুদ্রা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে পাওয়া যায়।
গুপ্ত যুগে সমতটের উল্লেখ পাওয়া যায়। গুপ্ত সম্রাটদের শক্তিশালী শাসনের সময় সমতট তাদের রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্বলতা ও ভাঙনের পর দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর উত্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই সময় সমতট ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় লাভ করে।
পরবর্তী সময়ে খড়্গ রাজবংশ সমতটে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। খড়্গ শাসকদের তাম্রশাসন থেকে সমতটের প্রশাসন, ভূমিদান এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তাদের শাসনামলে এ অঞ্চলে বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পায় এবং প্রশাসনিক কাঠামো আরও সুসংগঠিত হয়।
এরপর দেব রাজবংশ সমতট অঞ্চলে শাসন প্রতিষ্ঠা করে। দেব শাসকদের সময় সমতট রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে আরও সমৃদ্ধ হয়। তাদের শাসনামলে ময়নামতি-লালমাই অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপনা ও শিক্ষাকেন্দ্রের বিকাশ ঘটে।
পরবর্তীকালে চন্দ্র রাজবংশ সমতটের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। চন্দ্র শাসকেরা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং সমতটকে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন। চন্দ্রদের সময় প্রশাসন, কৃষি, বাণিজ্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ ঘটে। ত্রৈলোক্যচন্দ্র, শ্রীচন্দ্র ও কল্যাণচন্দ্র প্রমুখ শাসকের নাম বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।
সমতটের রাজনৈতিক ইতিহাসে ময়নামতি-লালমাই অঞ্চল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আবিষ্কৃত শালবন বিহারসহ বিভিন্ন প্রত্নস্থল থেকে বোঝা যায় যে রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানও যথেষ্ট বিকশিত হয়েছিল।
সুতরাং, গুপ্ত-পরবর্তী সময় থেকে খড়্গ, দেব ও চন্দ্র রাজবংশের শাসন পর্যন্ত সমতট ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে সমতটের এই ধারাবাহিক রাজনৈতিক বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক অবস্থা
প্রাচীন সমতটের অর্থনীতি মূলত কৃষি, বাণিজ্য, মৎস্য আহরণ, কারুশিল্প ও নৌযোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল ছিল। সমতটের ভৌগোলিক অবস্থান এবং নদীবিধৌত উর্বর সমতল ভূমি কৃষির বিকাশের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী ছিল। নদ-নদীর মাধ্যমে পলি জমে মাটি উর্বর হওয়ায় এখানে ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদিত হতো। কৃষির ওপর নির্ভর করে গ্রামীণ জনপদ গড়ে ওঠে এবং কৃষিপণ্য স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাণিজ্যেও ব্যবহৃত হতো।
সমতটের অর্থনীতিতে নদী ও জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। মেঘনা ও অন্যান্য নদীর বিস্তৃত জলপথের কারণে মাছ ধরা ছিল মানুষের অন্যতম জীবিকা। নদী থেকে বিভিন্ন ধরনের মাছ ও জলজ সম্পদ সংগ্রহ করা হতো। নদীপথ কৃষিপণ্য ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রেও সহজ ও কার্যকর যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি করেছিল।
সমতটের অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাণিজ্য। নদীপথে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের পাশাপাশি দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার অন্যান্য অঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকার সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। স্থলপথেও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের সঙ্গে পণ্য বিনিময় হতো। কৃষিপণ্য, মৎস্যজাত দ্রব্য, বস্ত্র, মৃৎপাত্র, ধাতব সামগ্রী ও অন্যান্য স্থানীয় পণ্য বাণিজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এ অঞ্চলে কারুশিল্পেরও বিকাশ ঘটেছিল। মৃৎশিল্প, ধাতুশিল্প, বয়ন ও নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগররা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ময়নামতি-লালমাই অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে সমতটের উন্নত কারুশিল্প ও নগরজীবনের পরিচয় পাওয়া যায়।
এভাবে কৃষি, মৎস্য, কারুশিল্প, নদীপথ ও বাণিজ্যের সমন্বয়ে সমতটের অর্থনীতি বিকশিত হয়েছিল এবং দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় এ জনপদ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হয়।
ধর্ম ও সংস্কৃতি
সমতট ছিল প্রাচীন বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। ভৌগোলিক অবস্থান ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের কারণে বিভিন্ন ধর্ম, মতাদর্শ ও সংস্কৃতির মানুষের মধ্যে এখানে পারস্পরিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে বৌদ্ধধর্ম সমতট অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। পাশাপাশি হিন্দুধর্মের বিভিন্ন ধারা ও আচার-অনুষ্ঠানেরও প্রচলন ছিল। ফলে সমতটের ধর্মীয় সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়।
বৌদ্ধধর্মের প্রসার
সমতটে বৌদ্ধধর্মের প্রসারের অন্যতম প্রধান প্রমাণ পাওয়া যায় বর্তমান কুমিল্লার ময়নামতি-লালমাই অঞ্চলে। এখানে বিভিন্ন সময়ে অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার, মন্দির ও ধর্মীয় স্থাপনা নির্মিত হয়। এর মধ্যে শালবন বিহার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শালবন বিহারের ধ্বংসাবশেষ থেকে বোঝা যায় যে এটি শুধু ধর্মচর্চার স্থানই ছিল না; বরং শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। ময়নামতি অঞ্চলের প্রত্নস্থলগুলো থেকে বিভিন্ন বুদ্ধমূর্তি, পোড়ামাটির ফলক, মুদ্রা, অলংকরণ ও স্থাপত্য নিদর্শন পাওয়া গেছে, যা সমতটের সমৃদ্ধ বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে।
হিন্দুধর্মের প্রভাব
বৌদ্ধধর্মের পাশাপাশি সমতটে হিন্দুধর্মও প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ধর্মীয় স্থাপনার মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়। বিভিন্ন রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতিচর্চার বিকাশ ঘটে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতি
সমতটের বৌদ্ধ বিহারগুলোতে শিক্ষা, দর্শন, ধর্মতত্ত্ব ও জ্ঞানচর্চা পরিচালিত হতো। দেশ-বিদেশের ভিক্ষু ও শিক্ষার্থীদের আগমন এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক যোগাযোগকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল। স্থাপত্য, ভাস্কর্য, পোড়ামাটির শিল্প এবং কারুশিল্পেও এর প্রভাব স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে, বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মের সহাবস্থান, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা, শিল্প-স্থাপত্য এবং বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সমতট প্রাচীন বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব
প্রাচীন সমতট জনপদের ইতিহাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভের ক্ষেত্রে ময়নামতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চল। বর্তমান কুমিল্লার লালমাই-ময়নামতি এলাকায় আবিষ্কৃত অসংখ্য প্রত্নস্থল ও প্রত্ননিদর্শন থেকে সমতটের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে ময়নামতির বৌদ্ধবিহারগুলো প্রমাণ করে যে সমতট একসময় বৌদ্ধ ধর্মচর্চা, শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছিল।
শালবন বিহার
ময়নামতির প্রত্নস্থলগুলোর মধ্যে শালবন বিহার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নিদর্শনগুলোর একটি। এটি একটি বৃহৎ বৌদ্ধবিহার, যার চারদিকে আবাসিক কক্ষ এবং মাঝখানে একটি কেন্দ্রীয় মন্দির ছিল। এর পরিকল্পিত নির্মাণশৈলী তৎকালীন স্থাপত্যশিল্পের উৎকর্ষের পরিচয় দেয়। বিহারটি থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন প্রত্নবস্তু সমতটের বৌদ্ধ ধর্মীয় জীবন ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে।
কুটিলা মুড়া ও আনন্দ বিহার
কুটিলা মুড়া ময়নামতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল। এখানে পাশাপাশি অবস্থিত কয়েকটি স্তূপ ও ধর্মীয় স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এগুলো তৎকালীন বৌদ্ধ ধর্মীয় আচার ও স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে। অন্যদিকে আনন্দ বিহার তার বৃহৎ আকার ও স্থাপত্য পরিকল্পনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিহার থেকে বোঝা যায় যে সমতটে সংগঠিত বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাকেন্দ্রের বিকাশ ঘটেছিল।
তাম্রশাসন ও মুদ্রা
ময়নামতি অঞ্চলে আবিষ্কৃত তাম্রশাসন সমতটের ইতিহাস পুনর্গঠনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত উৎস। এসব তাম্রশাসনে রাজা, ভূমিদান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। ফলে সমতটের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়। এছাড়া আবিষ্কৃত মুদ্রা থেকে তৎকালীন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং শাসকদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়।
ভাস্কর্য ও শিল্পনিদর্শন
ময়নামতি থেকে আবিষ্কৃত বুদ্ধমূর্তি, ব্রোঞ্জ ও পাথরের ভাস্কর্য, পোড়ামাটির ফলক, অলংকরণ সামগ্রী এবং অন্যান্য শিল্পনিদর্শন সমতটের উন্নত শিল্পরুচির পরিচয় বহন করে। পোড়ামাটির ফলক ও ভাস্কর্যে ধর্মীয় বিষয়ের পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পোশাক, অলংকার, প্রাণী ও বিভিন্ন সামাজিক দৃশ্যের চিত্রও ফুটে উঠেছে।
সমতটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
প্রাচীন সমতটের ইতিহাস, সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভের ক্ষেত্রে ময়নামতির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। ময়নামতি থেকে আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো শুধু ধর্মীয় ইতিহাসের উপাদান নয়; এগুলোর মাধ্যমে প্রাচীন সমতটের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষ করে ময়নামতির বৌদ্ধবিহার ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলো সমতটে বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক প্রসারের প্রমাণ বহন করে।
প্রথমত, ময়নামতির শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, কুটিলা মুড়া প্রভৃতি প্রত্নস্থল থেকে তৎকালীন স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার উন্নতির পরিচয় পাওয়া যায়। বিশাল বিহার, মন্দির, স্তূপ ও আবাসিক কক্ষ নির্মাণে যে পরিকল্পনা ও কারিগরি দক্ষতা ব্যবহৃত হয়েছিল, তা সমতটের উন্নত স্থাপত্যশিল্পের প্রমাণ।
দ্বিতীয়ত, ময়নামতির বিভিন্ন তাম্রশাসন, মুদ্রা ও শিলালিপি সমতটের রাজনৈতিক ইতিহাস পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব নিদর্শনের মাধ্যমে বিভিন্ন শাসক, রাজবংশ, ভূমিদান, প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়। ফলে লিখিত ইতিহাসের অনেক তথ্য যাচাই ও পরিপূরক করা সম্ভব হয়েছে।
তৃতীয়ত, ময়নামতির প্রত্ননিদর্শন থেকে সমতটের অর্থনৈতিক জীবনের চিত্রও পাওয়া যায়। মুদ্রা, কারুশিল্পের নিদর্শন, মৃৎপাত্র ও অন্যান্য সামগ্রী থেকে উৎপাদন, ব্যবহার ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ধারণা করা যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাস্কর্য ও পোড়ামাটির ফলক থেকে তৎকালীন মানুষের পোশাক, অলংকার, সামাজিক জীবন ও শিল্পরুচি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
সবশেষে, ময়নামতির প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো প্রমাণ করে যে সমতট ছিল ধর্ম, শিক্ষা, শিল্প ও সংস্কৃতির একটি সমৃদ্ধ কেন্দ্র। তাই প্রাচীন সমতটের সামগ্রিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রকৃত পরিচয় উদ্ঘাটনে ময়নামতি একটি অমূল্য ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ।
সমতট ছিল প্রাচীন বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। রাজনৈতিক শক্তি, কৃষি-বাণিজ্য, ধর্ম ও সংস্কৃতির বিকাশে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। বিশেষ করে ময়নামতি ও শালবন বিহারের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সমতটের সমৃদ্ধ বৌদ্ধ সভ্যতার পরিচয় বহন করে। তাই প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে সমতটের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।