প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার বৈশিষ্ট্যসমূহ/পারিপার্শ্বিক চিত্র।

আফ্রিকা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহাদেশ এবং মানবসভ্যতার প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রাচীন মিশর, নুবিয়া, ইথিওপিয়া, মালি, ঘানা, সংহাই, কঙ্গো, গ্রেট জিম্বাবুয়ে প্রভৃতি সভ্যতা ও রাষ্ট্র আফ্রিকার দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ। তাই প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকাকে কেবল পশ্চাৎপদ বা অন্ধকারাচ্ছন্ন অঞ্চল হিসেবে দেখলে এর ইতিহাসের বৈচিত্র্য ও সাফল্য যথাযথভাবে বোঝা যায় না। UNESCO-এর General History of Africa-তেও আফ্রিকার ইতিহাসে রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, কৃষি, ধাতুবিদ্যা, বাণিজ্য ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের দীর্ঘ বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এখানে প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকা বলতে মূলত ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগের সময়কে বোঝানো হচ্ছে। বিশেষ করে ১৮৮০-এর দশকে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার পূর্ববর্তী সময়ে আফ্রিকায় বিভিন্ন রাজ্য, সাম্রাজ্য, নগরকেন্দ্র, গ্রামীণ সমাজ ও গোত্রভিত্তিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। ১৮৮০ সালেও আফ্রিকার প্রায় ৮০ শতাংশ অঞ্চল নিজস্ব রাজা-রানি, গোত্রপ্রধান ও স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা শাসিত ছিল বলে UNESCO-র General History of Africa উল্লেখ করে।।


প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার বৈশিষ্ট্যসমূহ/পারিপার্শ্বিক চিত্র।
প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার বৈশিষ্ট্যসমূহ


প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার বৈশিষ্ট্য

প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় নানা বৈচিত্র্য ছিল। নিচে এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করা হলো—

১. বাসস্থান

প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার অধিকাংশ মানুষ গ্রাম, নদী উপত্যকা, তৃণভূমি, বনাঞ্চল ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলে বসবাস করত। তবে সমগ্র আফ্রিকার মানুষের বাসস্থান একই ধরনের ছিল না। কোথাও কাঁচা মাটির ঘর, কোথাও খড়ের ছাউনি, আবার কোথাও পাথর বা কাঠের তৈরি অপেক্ষাকৃত উন্নত স্থাপনা দেখা যেত।
গ্রামীণ সমাজে পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনকে কেন্দ্র করে বসতি গড়ে উঠত। পরিবেশ ও জলবায়ুর ওপর ভিত্তি করে বাসস্থানের ধরন পরিবর্তিত হতো। সাহারা অঞ্চলের যাযাবর জনগোষ্ঠীর জীবনধারা যেমন ছিল ভিন্ন, তেমনি পশ্চিম আফ্রিকার কৃষিভিত্তিক গ্রাম বা পূর্ব আফ্রিকার পশুপালননির্ভর সমাজের বাসস্থানও ছিল আলাদা।
তবে দারিদ্র্য ও সীমিত প্রযুক্তির কারণে অনেক অঞ্চলে সাধারণ মানুষের বাসস্থান ছিল অনুন্নত। নগরকেন্দ্রগুলোর বাইরে স্বাস্থ্যসম্মত পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও উন্নত অবকাঠামোর অভাবও ছিল। তাই বাসস্থানকে প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখা যায়।

২. খাদ্যাভ্যাস

আফ্রিকার খাদ্যাভ্যাস ছিল অঞ্চলভেদে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কৃষিনির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্যের মধ্যে শস্য, জোয়ার, বাজরা, যাম, কাসাভা, কলা, ধান ও বিভিন্ন শাকসবজি অন্তর্ভুক্ত ছিল। নদী ও হ্রদসংলগ্ন অঞ্চলে মাছ এবং পশুপালননির্ভর সমাজে দুধ ও মাংস গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য ছিল।
অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর খাদ্যাভ্যাসও নির্ভর করত। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য ছিল সাধারণত সীমিত ও স্থানীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে রাজদরবার ও বাণিজ্যিক নগরকেন্দ্রগুলোতে তুলনামূলকভাবে বৈচিত্র্যময় খাদ্য পাওয়া যেত।
তবে আফ্রিকার সব জনগোষ্ঠীকে ‘কম আহারভোজী’ বা একই ধরনের খাদ্যাভ্যাসের অধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়। ভৌগোলিক পরিবেশ, কৃষি, পশুপালন, বাণিজ্য ও ধর্মীয় রীতির কারণে অঞ্চলভেদে খাদ্যাভ্যাসের যথেষ্ট পার্থক্য ছিল।

৩. নিরক্ষরতা ও শিক্ষাব্যবস্থা

প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার অনেক অঞ্চলে আধুনিক অর্থে বিদ্যালয়ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা সীমিত ছিল। ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে লিখিত শিক্ষার হার অনেক অঞ্চলে কম ছিল। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আফ্রিকায় শিক্ষা বা জ্ঞানচর্চা ছিল না।
আফ্রিকার বহু সমাজে মৌখিক ঐতিহ্য ছিল জ্ঞান সংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম। বংশপরম্পরায় ইতিহাস, লোককথা, ধর্মীয় বিশ্বাস, আইন, কৃষি ও সামাজিক রীতিনীতি মুখে মুখে প্রচারিত হতো। আবার উত্তর ও পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম সমাজে মসজিদ ও মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে আরবি ভাষায় শিক্ষার বিকাশ ঘটে। টিম্বাক্টুর মতো নগরকেন্দ্র জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়।
অতএব প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার শিক্ষাকে কেবল ইউরোপীয় ধাঁচের বিদ্যালয়ের অনুপস্থিতি দিয়ে বিচার করলে বাস্তব চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়। UNESCO-র ইতিহাস প্রকল্পও আফ্রিকার ইতিহাস পুনর্গঠনে মৌখিক ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি ও স্থানীয় জ্ঞানকে গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছে।

৪. রাজনৈতিক ব্যবস্থা

প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। আফ্রিকায় একদিকে ঘানা, মালি, সংহাই, কঙ্গো ও ইথিওপিয়ার মতো বৃহৎ রাজ্য ও সাম্রাজ্য ছিল; অন্যদিকে ছোট ছোট রাজ্য, নগররাষ্ট্র, গোত্র ও বংশভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনও ছিল।
অনেক রাজ্যে রাজা বা সম্রাট কেন্দ্রীয় শাসন পরিচালনা করতেন। তাঁর অধীনে সামরিক কর্মকর্তা, প্রশাসক, ধর্মীয় নেতা ও স্থানীয় শাসকেরা কাজ করত। আবার কিছু সমাজে গোত্রপ্রধান, বংশপ্রধান বা প্রবীণদের পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত।
উনিশ শতকের শেষভাগে ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারের পূর্বে আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চল এখনও নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অধীনে ছিল। UNESCO-র তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮০ সালেও আফ্রিকার প্রায় ৮০ শতাংশ ভূখণ্ড বিভিন্ন আকারের আফ্রিকান রাজ্য, সাম্রাজ্য, সম্প্রদায় ও রাজনৈতিক সত্তার অধীনে ছিল।

৫. জীবনযাপন

প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার মানুষের জীবনযাত্রা মূলত কৃষি, পশুপালন, শিকার, মাছ ধরা, কারুশিল্প ও বাণিজ্য নির্ভর ছিল। গ্রাম ছিল সামাজিক জীবনের প্রধান কেন্দ্র। পরিবার ও আত্মীয়তার সম্পর্ক সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
কিছু জনগোষ্ঠী স্থায়ী কৃষিজীবনযাপন করত, আবার কিছু জনগোষ্ঠী পশুপালন বা যাযাবর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিল। সাহারা ও সাহেল অঞ্চলের বহু জনগোষ্ঠী দীর্ঘ দূরত্বে পশুপালন ও বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পূর্ব আফ্রিকার কিছু সমাজেও পশুপালন ছিল অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
অন্যদিকে নদী ও সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে মাছ ধরা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বিকশিত হয়। ফলে জীবনযাত্রায় একক কোনো বৈশিষ্ট্য ছিল না; বরং পরিবেশ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের জীবনধারা গড়ে উঠেছিল।

৬. অর্থনৈতিক ব্যবস্থা

প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার অর্থনীতি ছিল বহুমুখী। কৃষি ছিল অধিকাংশ সমাজের প্রধান জীবিকা। এর পাশাপাশি পশুপালন, শিকার, মাছ ধরা, লৌহশিল্প, মৃৎশিল্প, বয়ন, চামড়াশিল্প ও অন্যান্য কারুশিল্পও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে। সাহারা অতিক্রমকারী বাণিজ্যপথে স্বর্ণ, লবণ, হাতির দাঁত ও অন্যান্য পণ্য আদান-প্রদান হতো। পশ্চিম আফ্রিকার মালি ও সংহাই সাম্রাজ্য এই বাণিজ্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল।
পূর্ব আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে আফ্রিকার সঙ্গে আরব, পারস্য ও ভারতীয় বণিকদের যোগাযোগ গড়ে ওঠে। UNESCO-র ইতিহাসে আফ্রিকার বহির্বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের দীর্ঘ ধারাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

৭. কারুশিল্প ও ধাতুশিল্প

আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে লোহা ও তামার কাজ, মৃৎশিল্প, বয়ন, অলংকার তৈরি ও অস্ত্র নির্মাণ যথেষ্ট উন্নত ছিল। বিশেষ করে লৌহপ্রযুক্তির বিস্তার কৃষি ও অস্ত্র উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।
স্থানীয় কারিগররা কৃষির সরঞ্জাম, অস্ত্র, অলংকার, মাটির পাত্র ও দৈনন্দিন ব্যবহারের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করত। এসব পণ্য স্থানীয় বাজারে ব্যবহারের পাশাপাশি দূরবর্তী অঞ্চলেও বাণিজ্যের মাধ্যমে পৌঁছাত। UNESCO-র আফ্রিকার প্রাচীন সভ্যতা বিষয়ক গবেষণায় কৃষি ও ধাতুবিদ্যার বিকাশকে আফ্রিকার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

৮. জাতিগত ও ভাষাগত বৈচিত্র্য

প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অসাধারণ জাতিগত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য। আফ্রিকায় বহু জাতিগোষ্ঠী ও শত শত ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। উত্তর আফ্রিকা, পশ্চিম আফ্রিকা, মধ্য আফ্রিকা, পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ আফ্রিকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষা, ধর্ম, সামাজিক রীতি ও জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল।
ঐতিহাসিকভাবে ‘হেমীয়’, ‘নিগ্রো’ ইত্যাদি পুরোনো শ্রেণিবিভাগ ব্যবহার করা হলেও আধুনিক ইতিহাস ও নৃতত্ত্বে এসব ঔপনিবেশিক যুগের শ্রেণিবিন্যাসকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা হয়। আফ্রিকার জনগোষ্ঠীকে কয়েকটি সরল ‘জাতি’তে ভাগ করলে তাদের প্রকৃত ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য যথাযথভাবে প্রকাশ পায় না।

৯. ধর্মীয় বৈচিত্র্য

ধর্মীয় জীবনও ছিল প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় ধর্মবিশ্বাস, পূর্বপুরুষের উপাসনা, প্রকৃতিপূজা এবং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।
উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। পূর্ব আফ্রিকার উপকূলেও ইসলাম ও ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। খ্রিস্টধর্মেরও দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, বিশেষ করে ইথিওপিয়ায় প্রাচীনকাল থেকেই খ্রিস্টীয় ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল।
অর্থাৎ আফ্রিকার ধর্মীয় জীবন ছিল একক নয়; বরং স্থানীয় বিশ্বাস, ইসলাম ও খ্রিস্টধর্মের পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ে গঠিত ছিল।

১০. ইউরোপীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ

ইউরোপীয়দের সঙ্গে আফ্রিকার যোগাযোগ উপনিবেশ স্থাপনের অনেক আগেই শুরু হয়। বিশেষ করে পঞ্চদশ শতক থেকে পর্তুগিজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকেরা আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করে। দুর্গ, বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠে।
এই যোগাযোগের মাধ্যমে পণ্য, ধর্ম, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক উপাদানের আদান-প্রদান হয়। একই সঙ্গে দাস বাণিজ্য আফ্রিকা-ইউরোপ সম্পর্কের একটি গভীর ও ধ্বংসাত্মক অধ্যায় হয়ে ওঠে। গাম্বিয়া নদীর কুনটা কিন্তেহ দ্বীপের UNESCO বর্ণনাতেও প্রাক-ঔপনিবেশিক ও দাস বাণিজ্যের সময় আফ্রিকা-ইউরোপ যোগাযোগের ধারাটি তুলে ধরা হয়েছে।

১১. ইউরোপীয় আধিপত্য ও পরাধীনতার সূচনা

উনিশ শতকের শেষভাগে আফ্রিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন ঘটে। ১৮৮০-এর দশক থেকে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, পর্তুগাল ও ইতালি বিভিন্ন অঞ্চল দখল করে।
UNESCO-র General History of Africa অনুযায়ী, ১৮৮০ সালের দিকে আফ্রিকার অধিকাংশ অঞ্চল নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকলেও পরবর্তী প্রায় ৩০ বছরে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ১৯১৪ সালের মধ্যে ইথিওপিয়া ও লাইবেরিয়া ছাড়া প্রায় সমগ্র আফ্রিকা ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে চলে যায়।
এই পরিবর্তনের ফলে আফ্রিকার বহু পুরোনো রাজনৈতিক সীমানা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া হয় এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো নিজেদের প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীকালে ভূমি, শ্রম, খনিজ সম্পদ ও কৃষি উৎপাদনকে ঔপনিবেশিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

১২. ইউরোপীয়দের প্রতি প্রতিরোধ

আফ্রিকান জনগণ ইউরোপীয় আধিপত্যকে সর্বত্র নিষ্ক্রিয়ভাবে মেনে নেয়নি। বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় শাসক ও জনগোষ্ঠী সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। উনিশ শতকের আফ্রিকার ইতিহাসে ইউরোপীয় প্রভাবের পাশাপাশি আফ্রিকান সমাজগুলোর নিজেদের সংস্কার, রাষ্ট্রগঠন ও প্রতিরোধের নানা উদাহরণ রয়েছে। UNESCO-র General History of Africa উনিশ শতকের আফ্রিকাকে এমন এক সময় হিসেবে বর্ণনা করে, যখন ইউরোপীয় প্রভাব বাড়লেও আফ্রিকান সমাজগুলো নিজেদের মতো করে আধুনিকীকরণ, সম্প্রসারণ ও বিকাশের চেষ্টা করেছিল।
অতএব আফ্রিকানদের ইউরোপীয়দের প্রতি প্রতিক্রিয়া সর্বত্র একই ছিল না। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও কূটনীতি, কোথাও বাণিজ্যিক সহযোগিতা এবং কোথাও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।।



‘অন্ধকার মহাদেশ’ ধারণা সম্পর্কে

প্রাচীন ও প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকাকে ইউরোপীয় লেখালেখিতে কখনো ‘অন্ধকার মহাদেশ’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এই ধারণাটি মূলত ইউরোপীয়দের আফ্রিকা সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান, ভূগোল ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চল সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং পরবর্তীকালের ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ইতিহাসের উত্তর লেখার সময় শব্দটি ব্যবহার করলে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা উচিত।
আধুনিক আফ্রিকার ইতিহাসচর্চা আফ্রিকাকে কেবল দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা বা পশ্চাৎপদতার দৃষ্টিতে দেখে না। UNESCO-এর General History of Africa আফ্রিকার ইতিহাসকে আফ্রিকান জনগণের দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে এবং মৌখিক ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও স্থানীয় জ্ঞানকেও ঐতিহাসিক উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছে।।


সার্বিকভাবে বলা যায়, প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকা ছিল বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের একটি বিশাল ভূখণ্ড। এখানে একদিকে দারিদ্র্য, সীমিত অবকাঠামো, নিরক্ষরতা ও স্থানীয় সংঘাতের মতো সমস্যা ছিল; অন্যদিকে শক্তিশালী রাজ্য ও সাম্রাজ্য, কৃষি ও ধাতুবিদ্যার বিকাশ, দূরপাল্লার বাণিজ্য, নগরসভ্যতা, ধর্মীয় বৈচিত্র্য এবং সমৃদ্ধ মৌখিক সংস্কৃতিও ছিল। UNESCO-র গবেষণায়ও আফ্রিকার ইতিহাসে রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, বাণিজ্য ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের দীর্ঘ ধারাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অতএব প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকাকে শুধু ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ’ হিসেবে অভিহিত করা ইতিহাসের পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। বরং বলা যায়, ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের পূর্বে আফ্রিকা ছিল বহু স্বতন্ত্র সমাজ, রাজ্য, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমন্বয়ে গঠিত একটি বৈচিত্র্যময় মহাদেশ। পরবর্তীকালে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ এই বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর গভীর প্রভাব ফেলে; ১৮৮০-এর দশক থেকে শুরু হওয়া দখল ও বিভাজনের মাধ্যমে মহাদেশটির রাজনৈতিক মানচিত্র ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন
🔥 SPECIAL OFFER Daraz Affiliate
-0%
DARAZ DEAL

Product Title

৳৳0 ৳৳0

Product Description

🛒 এখনই কিনুন
⬇ Download কালকথা apk
কালকথা © 2026 | সকল স্বত্ব সংরক্ষিত